প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৮ আগস্ট, ২০২৫ । ১২:২০ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

বৃষ্টি অভিযোগে পেঁয়াজের দাম আকাশছোঁয়া, সবজি-মুরগির দামে ঊর্ধ্বগতি

অনলাইন ডেস্ক

দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম লাগামছাড়া গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অনেকাংশে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে পেঁয়াজ, মুরগি ও ডিমের দাম এক সপ্তাহের মধ্যে নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। বর্ষাকালীন অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাতকে এই মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, বাস্তবে সরবরাহ শৃঙ্খলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন এবং বাজারের নানা স্তরে দাপট চালানো অসংগঠিত বাজার কার্যক্রমই এই পরিস্থিতির মূল কারণ।

রাজধানী ঢাকা শহরের খিলক্ষেত, কারওয়ান বাজার, শাহজাদপুর, বাড্ডা, নতুন বাজার ও রামপুরা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পেঁয়াজের দাম হু হু করে বাড়ছে। খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ৮০ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে পৌঁছেছে, যা গত এক সপ্তাহে প্রায় ১৫-২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ফার্মের মুরগির ডিমের দামও প্রতি ডজন ১০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য সবজির দামও আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েছে, ফলে ক্রেতারা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন।

ইসলামি ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান খিলক্ষেত বাজার থেকে সম্প্রতি দেশি পেঁয়াজ কিনে মর্মাহত হয়েছেন। গত শনিবার তিনি ৫৫ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ কিনেছিলেন, কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই দাম বেড়ে ৭৫ টাকা হয়েছে। তিনি বলেন, “দেশি পেঁয়াজের মজুত এখনও শেষ হওয়ার কথা নয়, নতুন মৌসুম আসতে বাকি প্রায় চার মাস। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা হবে, বুঝতে পারছি না। এটা কি কারো পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র না?”

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে কৃষি উৎপাদন ও পণ্যের সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পণ্য আসার গতি কমে গেছে, যার ফলে দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারওয়ান বাজারের পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে তারা পেঁয়াজের দাম ১৫ টাকার বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে দেখতে পেয়েছেন। তারা জানান, পাবনা ও ফরিদপুর অঞ্চলের মোকামে প্রতি মণ পেঁয়াজের দাম প্রায় ৪০০ টাকা বেড়েছে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, গত এক মাসে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, ডিম ও মসুর ডালের দামেও ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডিমের বাজারে সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারওয়ান বাজারের এক ডিম বিক্রেতা জানান, আগে ডিমের চাহিদা কম থাকায় অনেক খামারি উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছিলেন, ফলে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

মুরগির দামও বেড়েছে কেজিপ্রতি ১০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির দাম এখন ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা প্রতি কেজি, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় বেশি। মসুর ডালের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ১৫ টাকা বাড়েছে, যেখানে ভালো মানের আলুর দাম কিছু কিছু জায়গায় কমলেও, বেশিরভাগ জায়গায় এখন ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত।

সবজির দিক থেকে দেখা যাচ্ছে, টমেটোর দাম এখন ২০০ টাকার আশেপাশে, গাজরের দাম কেজিপ্রতি ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কাঁচা মরিচের দাম এতটাই বেড়েছে যে, প্রতি কেজি দাম এখন ২৪০ থেকে ২৮০ টাকার মধ্যে। সবচেয়ে কম দামের সবজি হিসেবে পেঁপে রয়েছে, যার কেজি দাম মাত্র ২০ টাকা।

মাছের বাজারে ইলিশের দাম জনসাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ইলিশের পূর্ণ মৌসুমে থাকলেও দাম প্রতি কেজিতে ২,৬০০ থেকে ২,৯০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা দিয়ে প্রায় ৫০ কেজি চাল কেনা সম্ভব। ছোট ইলিশের দামও কম নয়, ১,৪০০ থেকে ১,৬০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের মৌলিক কার্যক্রম থমকে গেছে। বিশেষ করে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বাধা দেখা দিয়েছে। বর্ষা ও বন্যার মৌসুমে পণ্যের ঘাটতি স্বাভাবিক হলেও, সরকারের উচিত এখনই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারকে বাজারে পণ্যের মজুদ ও সঠিক বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়তেই থাকবে।’

প্রিন্ট করুন