কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সাইফুদ্দিন মুকুলের বিরুদ্ধে ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের তালিকায় নিজের স্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। শুধু চেয়ারম্যানই নন, কয়েকজন ইউপি সদস্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রীর নামও তালিকায় যোগ হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় অসহায় ও দুস্থ নারীদের প্রতি মাসে বিনামূল্যে ৩০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। নতুন অর্থবছর ২০২৫-২৬ এ জন্য ইউনিয়নে মোট ১৮৭ জন নারী আবেদন করেন। যাচাই-বাছাই শেষে ৯৭ জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সভাপতি এবং ইউপি সচিব, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বাছাই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। গত ৩০ জুন এই তালিকা অনুমোদিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত দুস্থ নারীদের বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান নিজের স্ত্রী মোছা. আঞ্জুমান আরাসহ ইউপি সদস্যদের স্ত্রীদের নাম তালিকায় যুক্ত করেন। চেয়ারম্যানের স্ত্রীর নাম তালিকার ৬০ নম্বরে পাওয়া গেছে। স্বামী বা অভিভাবক হিসেবে চেয়ারম্যান নিজে নয়, তার ছোট ভাই আবুল কালাম আজাদের নাম দেওয়া হয়েছে।
শুধু চেয়ারম্যানের স্ত্রীই নন, ইউপি সদস্যদের পরিবারের বেশ কয়েকজনও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সোহেল রানার স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মিনাজুল ইসলামের স্ত্রী ময়না খাতুন, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য দাউদ আলীর স্ত্রী জরিনা খাতুন এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোশাররফ হোসেনের স্ত্রী সুন্দরী আক্তারের নাম তালিকায় রয়েছে। এছাড়া চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও রাজনৈতিক সমর্থকদের আত্মীয়দের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুদ্দিন মুকুল সাংবাদিকদের বলেন, “অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়ায় হয়তো কেউ আমার স্ত্রীকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে নাম দিয়েছেন। এছাড়া কয়েকজনের বিষয়ে অভিযোগ আছে। যাচাই-বাছাইয়ে কিছু ত্রুটি হয়েছে। বিষয়টি ইউএনও মহোদয় তদন্ত করছেন।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, চেয়ারম্যান দীর্ঘদিন থাইল্যান্ডপ্রবাসী ছিলেন এবং এলাকায় কোটিপতি হিসেবে পরিচিত। তার দোতলা বাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। এমন একজনের স্ত্রীর নাম দুস্থ নারীদের তালিকায় ওঠা স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গত ২৪ আগস্ট আমবাড়িয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. বকুল আলী ইউএনওর কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি শুধু চেয়ারম্যানের স্ত্রী নয়, ইউপি সদস্য ও ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের স্ত্রীদের নাম যুক্ত করা হয়েছে এবং অনেক নারীর কাছ থেকে কার্ডপ্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইউএনও মো. নাজমুল ইসলাম জানান, বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা সরেজমিন তদন্ত করবেন এবং পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ইউএনও বলেন, “তালিকায় যদি অসংগতি পাওয়া যায়, তবে প্রকাশের ছয় মাসের মধ্যে সংশোধনের সুযোগ আছে। সেক্ষেত্রে প্রকৃত দুস্থ নারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”
বর্তমানে বিষয়টি তদন্তাধীন। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অনিয়ম হলে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় নারীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি