চুয়াডাঙ্গা: সংসদ নির্বাচন ঘিরে উত্তাপ, দুই আসনেই কঠিন লড়াইয়ের আভাস
অন্তর্বর্তী সরকারের সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পর সারাদেশের মতো চুয়াডাঙ্গাতেও শুরু হয়েছে রাজনৈতিক উন্মাদনা। বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে পরিচিত এ জেলা দুটি আসনে বিভক্ত—একটি ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির ঘাঁটি, অপরটি জামায়াত অধ্যুষিত। ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনের পর বর্তমানে দুই আসনেই জামায়াতে ইসলামী বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা-১: প্রাক্তন মিত্রে পরিণত প্রতিদ্বন্দ্বী
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ছয়টি ও আলমডাঙ্গা উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন, দুটি পৌরসভা এবং দুটি থানা নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-১ আসন। ১৯৭৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এখানে একবারও জয় পায়নি। দীর্ঘদিন বিএনপি ও জামায়াতের জোট এ আসনকে প্রায় অজেয় করে তুলেছিল। তবে ২০০৮ সালের পর প্রহসনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হয়।
বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াত—এই দুই প্রাক্তন মিত্রই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে সক্রিয়। বিএনপি নির্ভর করছে তাদের বৃহৎ কর্মীভিত্তির ওপর, যদিও ৫ আগস্টের পর চাঁদাবাজির অভিযোগ তাদের ভাবমূর্তিতে আঘাত হেনেছে। অপরদিকে জামায়াত ভোটারদের সামনে তুলে ধরছে ‘ক্লিন ইমেজের’ প্রার্থী।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য শামসুজ্জামান দুদু, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল সৈয়দ কামরুজ্জামান এবং প্রয়াত এমপি শহিদুল ইসলামের মেয়ে মিলিমা ইসলাম বিশ্বাস মিলি। প্রত্যেকে নিজ নিজ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা ভোটারদের সামনে তুলে ধরছেন।
অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষে মাঠে আছেন অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল, যিনি স্থানীয় সরকারে বেশ কিছু আসনে বিজয়ের অভিজ্ঞতা রাখেন। তিনি কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
নতুন দল এনসিপি, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও নাম ঘোষণা করলেও মাঠে তাদের সক্রিয়তা তেমন চোখে পড়ছে না।
চুয়াডাঙ্গা-২: জামায়াতের মজবুত ঘাঁটি
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার চারটি, দামুড়হুদা উপজেলার আটটি ও জীবননগর উপজেলার আটটি ইউনিয়ন, দুটি পৌরসভা এবং তিনটি থানা নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-২ আসন। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত, পাশাপাশি রয়েছে রেলবন্দর ও চিনি কারখানার শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী।
এই আসনে ১৯৯১ সালে জামায়াত, ১৯৯৬ সালে বিএনপি ও ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী বিজয়ী হন। বর্তমানে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি ও জেলা বিএনপি সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু। যদিও তার এলাকায় উপস্থিতি কম থাকায় কর্মীদের মধ্যে হতাশা আছে, তবুও জেলা নেতারা বিশ্বাস করেন তিনি মাঠে নামলে পরিস্থিতি বদলাবে।
জামায়াতের প্রার্থী রুহুল আমিন—দলীয় কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও জেলা আমির—দীর্ঘদিন ধরে এখানকার রাজনীতিতে সক্রিয়। আওয়ামী লীগের বাধা উপেক্ষা করে তিনি দলীয় সংগঠন সুসংহত করেছেন। ইসলামপন্থী দলগুলোর জোট হলে এ আসনে তার অবস্থান আরও মজবুত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রুহুল আমিন শিক্ষাবৈষম্য দূরীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসও প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যদিও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।দুটি আসনেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে একসময়ের জোটসঙ্গী বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। বিএনপি নির্ভর করছে তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও অতীত ঐতিহ্যের ওপর, আর জামায়াত চেষ্টা করছে নিজেদের ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তি’ ও ধারাবাহিক মাঠপর্যায়ের কাজকে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে। নির্বাচনের দিন যত এগোবে, চুয়াডাঙ্গার রাজনৈতিক উত্তাপ ততই বাড়বে।















