অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: রক্তাক্ত হতে পারে নির্বাচন
নিখোঁজ অস্ত্র-গোলাবারুদ, বাড়ছে নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। যদিও নির্বাচন ঘিরে নানা প্রশ্ন ও শঙ্কা রয়ে গেছে, তবে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে ব্যস্ততা বাড়ছে, রাজনৈতিক দলগুলো সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে মাঠে নেমেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নিজেদের প্রস্তুত করছে। কিন্তু এই নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি করেছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র।
গত ৫ আগস্ট দেশের ৪৬০টি থানা ও ১১৪টি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। এ সময় প্রায় ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজারের বেশি গুলি লুট হয়ে যায়। এতদিনে প্রায় ৪ হাজার ৩৮৭টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো প্রায় দেড় হাজার অস্ত্র এবং আড়াই লাখের বেশি গুলি নিখোঁজ রয়েছে। শুধু তাই নয়, গণভবন থেকে এসএসএফ-এর বিশেষ নিরাপত্তা সরঞ্জাম, অত্যাধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, অ্যান্টি-ড্রোন গান ও বেতার ডিভাইসও চুরি হয়ে গেছে, যেগুলোর কোনো হদিস আজও মিলছে না।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশের এসব লুট হওয়া অস্ত্র এখন আন্ডারওয়ার্ল্ড, দাগী সন্ত্রাসী, চরমপন্থি গোষ্ঠী, রাজনৈতিক ক্যাডার এবং জেল পালানো আসামিদের হাতে ঘুরছে। ইতোমধ্যে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে খুন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। এর ফলে জননিরাপত্তা পরিস্থিতি ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এদিকে, গত তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ২০ হাজার অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছিল, যার বড় একটি অংশ রাজনৈতিক বিবেচনায়। গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই লাইসেন্সগুলো বাতিল করে দেয়। মালিকদের অস্ত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও প্রায় ৬ হাজার ২৪৫টি অস্ত্র জমা পড়েনি। ফলে সেগুলো এখন অবৈধ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত। সরকারের কাছে এ অস্ত্রগুলোর অবস্থানও অজানা। ধারণা করা হচ্ছে, কিছু অস্ত্র মালিকরা নিজেরাই রেখে দিয়েছে, আবার কিছু বিক্রি হয়ে গেছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের পর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী যেমন সানজিদুল ইসলাম ইমন, পিচ্চি হেলাল, কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, ফ্রিডম রাসু, ফ্রিডম সোহেলসহ আরও অনেকেই পুনরায় সংগঠিত হচ্ছেন। তারা দেশ-বিদেশ থেকে অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং লুট হওয়া অস্ত্রের বড় অংশ চড়া দামে কিনে নিয়েছেন। ফলে তারা নতুন করে দল গড়ে তুলছে, যা নির্বাচনের আগে বড় সহিংসতা ডেকে আনতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, “লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হলে নির্বাচনকালীন সময়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে এসব অস্ত্র দখল-বাণিজ্য, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে ব্যবহার হচ্ছে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত পুরনো পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ভিন্ন কৌশলে অভিযান পরিচালনা করা।”
অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া লাইসেন্সের অস্ত্র অবৈধ হলেও তার মালিকদের শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র অনেক বেশি বিপজ্জনক। কারণ এসব অস্ত্র দিয়ে অপরাধ করলে মালিকানা শনাক্ত করা যায় না। অপরাধীরা জানে যে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করলে তাদের আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে যায়। এ কারণে আসন্ন নির্বাচনের আগে সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণসহ একটি সমন্বিত চিরুনি অভিযান প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রায় ৭ হাজার ৬০০ অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র দেশের আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি। এগুলো উদ্ধার না হলে নির্বাচনে সহিংসতা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়তে পারে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত, কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

















