Header Border

ঢাকা, বুধবার, ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ (বসন্তকাল)

সালামের গুরুত্ব ও সঠিক প্রয়োগ

ইসলাম আল্লাহর মনোনীত ও গ্রহণযোগ্য একমাত্র ধর্ম। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন হলো একটি পূর্নাঙ্গ জীবন বিধান(Complete code of life)। মানব জীবনে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এমন কোন সমস্যা দেখা দিবে না (কেয়ামত পর্যন্ত) যার সমাধান (প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে) আল-কুরআনে তথা ইসলামে নেই। ইসলাম অত্যন্ত সহজ, সর্বজনীন, সাবলীল, শান্তি, কল্যাণের ধর্ম। “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য একমাত্র ধর্ম ইসলাম”। (আল-ইমরান:১৯)

> ইসলামের সর্বোত্তম কাজের একটি হলো সালাম। সালাম আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো শান্তি, প্রশান্তি, কল্যাণ, দোয়া, আরাম, আনন্দ ইত্যাদি। সালাম একটি সম্মানজনক, অভ্যর্থনামূলক, অভিনন্দনজ্ঞাপক, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পরিপূর্ণ ইসলামী অভিবাদন। ‘আসসালামু – আলাইকুম’ অর্থাৎ ‘আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’। সালামের মাধ্যমে পরস্পরের জন্য শান্তি ও কল্যাণ কামনা করা হয়। অনেকেই ‘স্লামালিকুম’, ‘স্লামালাইকুম’ ইত্যাদি বলে থাকেন, যা মোটেই ঠিক নয়। কেননা এতে অর্থের বিকৃতি ঘটে এবং সালামের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। সালাম দেওয়া সুন্নত এবং উত্তর দেওয়া ওয়াজিব তথা অবশ্য করনীয়।

>মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সর্বোত্তম মাধ্যম হলো সালাম। সালামের মাধ্যমে যেমন পরস্পর পরস্পরের জন্য দোয়া করা হয় তেমনি প্রীতিময়, সুন্দর, সুসম্পর্ক ও মনের মিল তৈরী হয়। কুরআনুল করীমে আল্লাহ তা’আলা সালাম আদান-প্রদানের পদ্ধতি বর্ণনা করে বলেন –
“যখন তোমাদের অভিবাদন করা হয় (সালাম দেয়া হয়), তখন তোমরাও (উত্তরে) তা অপেক্ষা উত্তম অভিবাদন কর অথবা ওরই অনুরূপ কর”। (সূরা নিসা: আয়াত-৮৬)
রাসূল (সা.) বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ তার মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন সে যেন তাকে সালাম দেয়। তবে এ সালামের মধ্যে অপর ভাইয়ের জন্য দোয়া ও শুভাকাঙ্ক্ষার মনোভাব থাকতে হবে’।

> রাসূলে করীম (সা.) বলেছেন, “কোন মুসলমান ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ হলে কথা বলার আগে সালাম দাও”। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বপ্রথম আদম (আ.)-কে সালাম দেয়ার শিক্ষা দেন। আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ পাক তাঁকে বলেন, ”তুমি যাও এবং ঐ যে ফেরেশতামণ্ডলীর একটি দল বসে আছে তাদের ওপর সালাম পেশ কর। আর ওরা তোমার সালামের কি জবাব দিচ্ছে তা মন দিয়ে শোন। কেননা ওটাই হবে তোমার ও তোমার সন্তান-সন্ততির সালাম বিনিময়ের রীতি”। অত:পর তিনি (আদম) বললেন (ফেরেশতাগণের কাছে গিয়ে), ‘আসসালামু আলাইকুম’। তাঁরা উত্তরে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকা ওয়া রাহমাতুল্লাহ’।
একবার এক ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘আসসালামু-আলাইকুম’। তখন রাসূল (সা.) বললেন, লোকটির জন্য ১০ টি নেকী লেখা হয়েছে। এরপর অন্য এক ব্যক্তি এসে (একটু বাড়িয়ে) বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’। আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, তাঁর জন্য ২০ টি নেকী লেখা হয়েছে। তারপর আরো এক ব্যক্তি এসে (আরো একটি শব্দ যোগ করে) বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহু’। তখন রাসূল (সা.) তাঁর সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, লোকটির জন্য ৩০ টি নেকী লেখা হয়েছে। (আবু দাউদ, তিরমিযী, মুসনাদে আহমদ, মেশকাত)

> রাসূলে পাক (সা.) বলেন, “যখন দুইজন মুসলমানের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয়, সালাম-মুসাফাহা (হাতে হাত মেলানো) করে, তখন একজন অপরজন থেকে পৃথক হওয়ার আগেই তাদের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়”।
হযরত আবু উমামাহ (রা.) বর্ননা করেন, রাসূলে করীম (সা.) বলেন, আল্লাহর নিকট উত্তম ব্যক্তি সে, যে মানুষকে আগে সালাম দেয়। হযরত মুহাম্মদ (সা.) সালামের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বলেন, ”কেউ যদি তার মুসলমান ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে তাহলে যেন তাকে সালাম দেয়। অতঃপর যদি কোন গাছ বা পাথর (অল্প সময়ের জন্য হলেও) দু’জনের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করার পর পুনরায় তাদের সাক্ষাৎ হয় তাহলে যেন আবার সালাম দেয় ”। এ হাদীস দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, কারো সাথে একই দিন বারবার সাক্ষাৎ হলে প্রতিবারই সালাম দিয়ে কথা শুরু করা সুন্নত। মোবাইল ফোনে কথা বলা যেহেতু অনেকটা সাক্ষাতে কথা বলার মতো তাই যতবার কথা বলবে ততবারই পরস্পর সালাম বিনিময় করা সুন্নত।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, “যখন তুমি কোন মজলিশে পৌঁছাবে তখন তুমি সালাম দিবে, আর যখন তুমি মজলিশ থেকে উঠে দাঁড়াবে তখনো সালাম দিবে। প্রথম সালাম শেষের সালাম থেকে অধিক গুরুত্ব বহন করে না।” (আবু দাউদ ও তিরমিযী)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা.) বলেন, ছোটরা যেন বড়দের সালাম দেয়, পায়ে হাঁটা ব্যক্তি যেন বসে থাকা ব্যক্তিকে সালাম দেয় এবং কমসংখ্যক লোক যেন বেশী সংখ্যক লোককে সালাম দেয়। (বুখারী ও মুসলিম)

>শরীয়তের বিধান হলো, পরস্পর কথা বলার সময় আগে সালাম দিয়ে কথা শুরু করা। তাই মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় হ্যালো না বলে সালাম দিয়ে কথা শুরু করতে হবে। হ্যালো বা অন্য কোন শব্দ দিয়ে কথা শুরু করলে নিঃসন্দেহে তা হবে সুন্নত পরিপন্থী কাজ। ‘আসসালামু কাবলাল কালাম’ অর্থাৎ সালাম হবে কথার পূর্বে। সুতরাং যিনি মোবাইল ফোনে আগে কথা বলবেন তিনিই সালাম দিবেন। ফোনে কথা বলার ক্ষেত্রে সাধারনত দেখা যায়, যিনি ফোন রিসিভ করেন তিনিই আগে কথা বলেন। রিসিভকারী যেহেতু আগে কথা বলে থাকেন তাই তিনিই প্রথমে সালাম দিবেন। অবশ্য কখনো রিসিভকারী যদি রিসিভ করে কথা না বলেন কিংবা কথা বললেও কোন কারণে কলপ্রদানকারী তা শুনতে না পায় তখন কলপ্রদানকারীই আগে কথা কথা বলে থাকেন। এমতাবস্থায় কলপ্রদানকারী যেহেতু আগে কথা বলছেন তাই কথা শুরুর আগে তিনিই প্রথমে সালাম দিবেন। এখানে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, নিয়মানুযায়ী প্রথমে যে-ই সালাম প্রদান করুক না কেন, অপরজনকে কিন্তু অবশ্যই সালামের উত্তর দিতে হবে। নচেৎ তিনি গুনাহের ভাগী হবেন। কেননা সালাম দেওয়া সুন্নত হলেও উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। (তিরমিযী, খন্ড:২, পৃষ্ঠা:৯৯)
রিসিভকারী এবং কলপ্রদানকারীর সালাম যদি একসাথে হয় সেক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান হলো উভয়কেই সালামের জবাব দিতে হবে। কিন্তু উভয়ের সালাম যদি একত্রে না হয়ে সামান্য আগে পরে হয় তাহলে পরে সালাম দানকারীকে পুনরায় উত্তর/জবাব দিতে হবে। যদি সে পুনরায় জবাব না দেয় তাহলে অর্থের দিক থেকে তার সালামটি প্রথম ব্যক্তির সালামের জবাব হয়ে যাবে এবং এর দ্বারা জবাব প্রদানের ওয়াজিব আদায় হবে। কিন্তু শব্দের দিক থেকে সুন্নত তরীকায় জবাব আদায় হবে না। কারণ তার এ জবাবটি ইচ্ছাকৃতভাবে হয়নি। (এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে …. সূরা নিসা : ৮৬)

>অনেক সময় দেখা যায় মোবাইল ফোনে ম্যাসেজের শুরুতে সালাম জানানো হয়। ম্যাসেজের মধ্যে লিখিত সালাম চিঠির মধ্যে লিখিত সালামের মতোই। অর্থাৎ উভয় প্রকার সালামের হুকুম একই। যেমনিভাবে চিঠিতে লিখিত সালামের জবাব মুখে বা জবাবী চিঠিতে লিখে দেওয়া যায়, অনুরূপভাবে ম্যাসেজে লিখিত সালামের জবাবও মুখে বা ফিরতি ম্যাসেজের মাধ্যমে দেওয়া যায়। মোদ্দাকথা মুখে বা লিখে যেকোনভাবে উত্তর দিলেই ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে উত্তম হলো সাথে সাথে মুখে উত্তর দিয়ে দেওয়া। কারণ এমনও হতে পারে, ফিরতি ম্যাসেজ পাঠানোর সময় পেল না কিংবা ভুলে গেল। তখনতো ওয়াজিব আদায় না করার গুনাহ ঘাড়ে বর্তাবে।
দূতের মাধ্যমে সালাম পাঠালে মুস্তাহাব হলো দূতকেও সালাম দেওয়া। মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় একজন অপরজনকে বলে থাকেন অমুকের নিকট আমার সালাম পৌঁছে দিবেন। এ ক্ষেত্রে সে যদি সালাম পৌঁছানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে তাহলে তার জন্য সালাম পৌঁছানো ওয়াজিব। যদি সে না পৌঁছায় (সালাম) তবে গুনাহগার হবে। আর যদি সালাম পৌঁছানোর ব্যাপারে কোনরকম অক্ষমতা বা অপারগতা প্রকাশ করে কিংবা চুপ করে থাকে তাহলে তার উপর সালাম পৌঁছানো ওয়াজিব নয়। এই নিয়ম শুধু মোবাইল ফোনে কথা বলার ক্ষেত্রেই নয়, সরাসরি কথা বলার সময়ও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
কখনো কখনো দেখা যায়, কোন বড় বা সম্মানী ব্যক্তির কাছে কল করার পর তিনি রিসিভ করে সালাম দিলে তার সালামের উত্তর না দিয়ে কলপ্রদানকারী তাকে পুনরায় সালাম দেয়। এটা সঠিক নয়। সঠিক নিয়ম হলো, বড় বা সম্মানী ব্যক্তি কল রিসিভ করে সালাম দিলে অপরপ্রান্ত থেকে (কলপ্রদানকারী) শুধু উত্তর দিবে, পাল্টা সালাম দিবে না। এক্ষেত্রে ছোট-বড় বলে কোন কথা নেই, যিনি কথা শুরু করবেন তিনিই সালাম দিবেন।
কল রিসিভকারী যদি না জেনে কোন অমুসলমান কলপ্রদানকারীকে সালাম দেয় সেক্ষেত্রে গুনাহ হবে না। কারণ জেনে-শুনে অমুসলিমকে সালাম দেওয়া নিষেধ। ভুলে কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে দিয়ে ফেললে গুনাহ হয় না। (আল ইমদাদ স্মারক’ ০৮, পৃষ্ঠা:১৮২)

>যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে তবে পর্দায় থেকে গায়রে মাহরাম মহিলাদের সাথে কথা বলা এবং কথা শুরুর পূর্বে সালাম দেওয়া জায়েয। আর নিয়ম যেহেতু যিনি আগে কথা শুরু করবেন তিনিই প্রথমে সালাম দিবেন তাই মহিলা আগে কথা বললে তিনি আগে সালাম দিবেন, আর পুরুষ আগে কথা বললে তিনি আগে সালাম দিবেন।(তিরমিযী; খন্ড: ০২, পৃষ্ঠা-৯৯)

>অন্যের গৃহে সালাম না দিয়ে প্রবেশ করা নিষেধ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্য গৃহে প্রবেশ করো না, যে পর্যন্ত আলাপ-পরিচয় না করো এবং গৃহবাসীদের সালাম না করো। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা স্মরণ রাখো”। (সূরা নূর; আয়াত:২৭)

ইসলামে সালামের গুরুত্ব অপরিসীম। সালাম শান্তির প্রতীক। মুমিন মুসলমানের উচিত পরস্পরের মাঝে সালামের ব্যাপক প্রচলন ঘটানো এবং কুরআনে শেখানো পদ্ধতি ও বিশ্বনবী (সা.)-এর নির্দেশনা মোতাবেক সালাম আদান প্রদান করে ফযীলত ও বরকত লাভ করা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে শরীয়তের ছোট-বড় সকল হুকুম পরিপূর্ণভাবে আদায় করার তওফিক দান করুন। আমীন।।

লেখক,
আবু হায়াত মোঃ শাফায়াত সিদ্দিকী সোহেল
সাবেক শিক্ষার্থী,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রিয় পোষ্ট সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন


আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন
শাবান মাসের ফজিলত ও আমল
শবে বরাতের আমল ও ফজিলত
আখেরাতে মুত্তাকিদের প্রতিদান
জিকির ও জ্ঞানের মজলিসের ফজিলত শায়খ ড. সালাহ বিন মুহাম্মাদ আল বুদাইর
মাওলানা লুৎফুর রহমানের সবশেষ অবস্থা জানাল পরিবার
শাবান মাসের ফজিলত-বরকত ও ইবাদত

ইসলাম এর আরও খবর

উপদেষ্টা মন্ডলীর সভাপতি: ডঃ মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন, উপদেষ্টা সম্পাদক: অধ্যাপক মোঃ আবুল কালাম, প্রধান সম্পাদক: রোটাঃ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম হৃদয় সম্পাদক ও প্রকাশক: ইঞ্জিঃ মোঃ ইমতিয়াজ সিদ্দিকী তোহা।
কার্যালয়: গ্রীন রোড, কাঁঠাল বাগান, ঢাকা ।