মাঠ প্রস্তুত, মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে একযোগে কাজ করব
চুয়াডাঙ্গা-১: ধানের শীষের পক্ষে জনসভায় শরীফুজ্জামান শরীফের আহ্বান, শহর ভর্তি ৩০ হাজার নেতা-কর্মী
আগামী ফেব্রুয়ারি-২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় শনিবার বিকেল অনুষ্ঠিত জেলা বিএনপির বিশাল জনসভায় লাখো নেতাকর্মী একত্রিত হয়ে দলীয় ঐক্য প্রদর্শন করেছেন। জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ সভাস্থল থেকে ঘোষণা করেন, “ধানের শীষের জন্য আমরা মাঠ রেডি রেখেছি। দল যাকে মনোনয়ন দেবে, আমরা তার পক্ষে একসাথে কাজ করব।”
শরীফ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ছিলেন। তিনি জনসভায় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য একটাই—ধানের শীষকে জয়ী করা। মনোনয়ন যেই হোক, আমরা দলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকব। ব্যক্তিগত স্বার্থ এখানে কোনো প্রাধান্য পাবে না।”
শনিবার দুপুরের পর থেকেই আলমডাঙ্গা পৌরসভা ও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে নেতা-কর্মীরা উপস্থিত হতে শুরু করেন। উপজেলা পরিষদ চত্বরের এরশাদ মঞ্চ দ্রুত ভরে যায়। সংলগ্ন রাস্তাগুলোও নেতাকর্মীর সমাগমে ভর্তি হয়ে যায়। বিকেল সাড়ে চারটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত পুরো শহরের প্রধান রাস্তাগুলো জানজটমুক্ত ছিল না। থানা রোড, স্টেশন রোড, চারতলা মোড়সহ শহরের অন্যান্য প্রধান সড়ক লোকে ভরে যায়।
জনসভাস্থল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার নেতা-কর্মী হেঁটেই আসেন। অনেকেই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আনন্দ উদযাপন করেন। জনসাধারণ বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে শহরকে উত্তেজনায় ভাসান, যেমন:
“শহীদ জিয়া অমর হোক, জিয়ার সৈনিক এক হও, এক জিয়া লোকান্তরে, লক্ষ্য জিয়া ঘরে ঘরে, তারেক জিয়া বীরের বেশে, আসবে ফিরে বাংলাদেশ।”
মো. শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, “একটি প্রায় ধ্বংসস্তুপ দলকে পুনর্গঠন করতে আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, বিশেষ করে জনাব তারেক রহমান, নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন। ফ্যাসিস্টদের নিপীড়ন, রাজনৈতিক রোডম্যাপ এবং দলীয় দুঃসময়ে আমরা কেন্দ্রীয় নির্দেশনার সঙ্গে সব অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছি।”
তিনি আরও বলেন, “মনোনয়ন নিয়ে আলাদা আলোচনা নয়। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য—ধানের শীষকে জয়ী করা। আমাদের জেলা বিএনপির প্রতিটি ইউনিট শক্তিশালী এবং আমরা তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে জনমানসে পৌঁছাতে সক্ষম। ইউনিয়ন কমিটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে, কোনো পকেট কমিটি নেই। এই কমিটি নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যকর নেতৃত্ব দিচ্ছে।”
শরীফ নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে বলেন, “একটি ভুল বা অবহেলা পুরো দলের ত্যাগকে বৃথা করতে পারে। দল সবকিছু জানে। আপনার আচরণে সাধারণ মানুষ যেন দলের দিকে আকৃষ্ট হয়, সেই দিকে নজর রাখতে হবে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্টদের দমন হয়েছিল। সেই মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “মনোনয়ন যেই হোক, আমরা ধানের শীষের হয়ে চুয়াডাঙ্গা-১ ও ২ আসনে মা নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং দেশনায়ক তারেক রহমানকে জয়ী করতে কাজ করব। ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা এখানে আসবে না। ১৭ বছরের মামলা, জেল এবং অত্যাচারের পর যারা বেঁচে আছেন, তাদের কথাও মনে রাখতে হবে। দলের প্রতি আনুগত্য ও শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে।”
জনসভায় আলমডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সঞ্চালনা করেন। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন:
জেলা বিএনপির সিনিয়র সদস্য খন্দকার আব্দুল জব্বার সোনা, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মীর্জা ফরিদুল ইসলাম শিপলু, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সফিকুল ইসলাম পিটু, খালিদ মাহমুদ মিল্টন, উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মো. আমিনুল হক রোকন, পৌর সাধারণ সম্পাদক মো. জিল্লুর রহমান ওল্টু, সদর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এম শাহজাহান মুকুল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর মণ্টু, জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি এম. জেনারেল ইসলাম, জেলা মহিলা দলের সভাপতি রউফ উর নাহার রিনা, জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক মোকাররম হোসেন, সদস্যসচিব তোবারক হোসেন, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুর রশীদ ঝণ্টু, জেলা মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান বাবলু, জেলা জাসাস-এর সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিমুল হাবিব সেলিম, জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. মোমিনুর রহমান মোমিন, জেলা আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক অ্যাড. আ স ম আব্দুর রউফ, জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাড. মারুফ সারোয়ার বাবু, জেলা ওলামা দলের আহ্বায়ক মাওলানা আনোয়ার হোসেন
শহরের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার সকল ওয়ার্ডের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ প্রায় ৩০,০০০ নেতা-কর্মী জনসভায় অংশ নেন।
জনসভায় উপস্থিত সাধারণ মানুষ, ছাত্র-ছাত্রী, নারী ও বৃদ্ধরা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্তিশালী উপস্থিতি অনুভব করতে পারছেন। একজন স্থানীয় শিক্ষার্থী বলেন, “আজকের জনসভা আমাদের দেখিয়েছে যে দল এখনও শক্তিশালী এবং তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা জনগণের পাশে।”
একজন বৃদ্ধ বলেন, “ধানের শীষ প্রতীকের জন্য এখানে এত বিশাল সমাবেশ আগে কখনো হয়নি। এটা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক চেতনা এখনো জাগ্রত।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, আলমডাঙ্গায় এত বিশাল জনসমাবেশ দলের সংগঠনের শক্তি, তৃণমূলের উপস্থিতি এবং আগামী নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের আগে জনমত তৈরি করার কার্যকর পদ্ধতির নিদর্শন। জনসভায় স্লোগান, ঢাক-ঢোল, এবং বিশাল জনসমাগম দেখিয়েছে দলীয় ঐক্য ও নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, “শরীফুজ্জামান শরীফের বক্তব্য এবং জনসমাবেশ থেকে বোঝা যাচ্ছে, চুয়াডাঙ্গার জেলা বিএনপি তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী এবং তারা মনোনয়ন যাই হোক, দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এটি আগামী নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক ইঙ্গিতও দেয়।”
জনসভা আয়োজনে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে রাস্তায় যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং জনসভাস্থল নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা হয়। তবে জনসাধারণের উপস্থিতি এত বেশি ছিল যে শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রায় পুরো সময় জনসমুদ্রের ভেতর আটকে যায়।
শনিবারের জনসভা চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইভেন্ট। এখানে শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য, নেতা-কর্মীদের উৎসাহ, বিশাল জনসমাগম এবং প্রাচীন সংগঠনকে পুনর্জাগরণের দৃঢ় প্রতিফলন দেখা গেছে। জনসভা প্রমাণ করেছে যে, দলীয় ঐক্য, তৃণমূলের শক্তি এবং নেতাদের নেতৃত্ব আগামী জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।


















