ইরানের শক্তি, ইসরায়েলের মেধা—ভারত কার দিকে ঝুঁকবে?
আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল অঙ্গনে একদিকে ভারতের বন্ধু ইরান, অপরদিকে ইসরায়েল। ইরান থেকে তেল আনে ভারত, আর ইসরায়েল থেকে পায় প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহায়তা। কিন্তু যখন এই দুই মিত্র রাষ্ট্রই মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন ভারতের অবস্থান কী হবে? এই প্রশ্ন ঘিরেই পরিচালক অরুণ গোপালনের থ্রিলার ‘তেহরান’ দর্শকদের নিয়ে যায় এমন এক জগতে, যেখানে কূটনীতি, নৈতিকতা ও মানবিকতা মিলেমিশে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তায় ভরা এক কাহিনি।
জন আব্রাহাম অভিনীত সিনেমার প্রেরণা এসেছে ২০১২ সালের দিল্লি বিস্ফোরণ থেকে। সেদিন ইসরায়েলি এক কূটনীতিকের গাড়িতে বোমা হামলা হয়। একই দিনে জর্জিয়া ও থাইল্যান্ডেও ঘটেছিল একই ধরনের হামলা। ইসরায়েল সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছিল। এই ঘটনাই সিনেমার মূল প্রেক্ষাপট।
জন অভিনীত এসিপি রাজীব কুমার শুরুতে তদন্তে অনাগ্রহী ছিলেন। কিন্তু এক পথশিশুর মৃত্যুর ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। ছোট্ট মেয়েটি ফুল বিক্রি করত, যাকে রাজীব প্রায়ই চিনতেন। মেয়েটির ভাইয়ের চোখের হতাশা যেন তাঁকে বাধ্য করে সত্য খুঁজতে। আর সেই সত্যের শেকড় গেঁথে আছে বৈশ্বিক রাজনীতির গভীরে—ইসরায়েলের ইরানি বিজ্ঞানী হত্যার পাল্টা প্রতিশোধ, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ভরা এক অস্থির দুনিয়া।
তবে রাজীব যখন সত্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছান, তখনই সরকার তাঁকে থামিয়ে দেয়। কারণ ভারত তেলচুক্তির জন্য ইরানের সমর্থন চাইছে। কিন্তু রাজীব কি কূটনীতির নামে অন্যায়কে আড়াল করবেন, নাকি বেপরোয়া পুলিশ হিসেবে নিজের পথে হাঁটবেন—এই দ্বন্দ্বই গল্পের মূল সুর। ‘তেহরান’ প্রচলিত বলিউডি থ্রিলারের মতো নয়। এখানে নেই গান, অতিরিক্ত গ্ল্যামার বা নায়কোচিত ভঙ্গি। অ্যাকশন, ধাওয়া, সামান্য রোমান্স থাকলেও তা সিনেমাকে ছাপিয়ে যায়নি। বরং চরিত্রগুলোর নৈতিক টানাপোড়েন, মানবিক প্রশ্ন ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতিফলন দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে।
সিনেমার শক্তি এর বাস্তবঘেঁষা নির্মাণ। পাকিস্তান-কেন্দ্রিক স্পাই স্টোরির বাইরে এসে ইরান–ইসরায়েল–ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। জন আব্রাহাম এর আগে ‘মাদ্রাজ ক্যাফে’, ‘বাতলা হাউস’, ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এ যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকায় সফল ছিলেন, এখানেও তাঁর সেই অভিজ্ঞতার ছাপ পাওয়া যায়। আবেগময় দৃশ্যে খানিক ঘাটতি থাকলেও চরিত্রে তিনি মানিয়ে গেছেন।
বিদ্যা চরিত্রে মানুষি ছিল্লারের ভূমিকা বেশ সীমিত; কেন তাঁকে নেয়া হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। তবে হিমাদ্রির চরিত্রে নির্মাতা কৌশিক মুখার্জির অভিনয় চমকে দেয়।
চিত্রগ্রাহক ইভজেনি গুব্রেঙ্কো ও আন্দ্রে মেনেজেসের ক্যামেরার কাজে সিনেমার গম্ভীর মেজাজ ফুটে উঠেছে। আবহসংগীতও যথাযথ। ফারসি ভাষার ব্যাপক ব্যবহার সাধারণ হিন্দি দর্শকের জন্য কিছুটা কষ্টকর হতে পারে। সম্ভবত সেই কারণেই প্রেক্ষাগৃহে নয়, তিন বছর পর সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে সরাসরি ওটিটিতে। তবু পরিচালক হয়তো চেয়েছেন জনপ্রিয়তার দৌড়ের বাইরে দাঁড়িয়ে সিনেমাটিকে ভাবনার জায়গা করে দিতে।
সব মিলিয়ে, ‘তেহরান’ শুধু অ্যাকশন থ্রিলার নয়, বরং ভারত–ইরান–ইসরায়েল সম্পর্কের মতো সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে মানবিকতা ও কূটনীতির সংঘাতকে তুলে ধরার এক ভিন্নধর্মী প্রচেষ্টা।
















